ঢাকা, বুধবার, ২০ জানুয়ারী ২০২১

৩৫ আন্দোলন: শিক্ষার মর্যাদাটুকু দেন, চাকরি চাই না…

:: তারেক মাহমুদ || প্রকাশ: ২০২০-১২-০৪ ১১:০৩:০০

২০০৬ সালে একটি বিষয় ব্যতীত প্রতিটি বিষয়ে লেটার মার্ক পেয়ে স্কুলে তথা ইউনিয়ন সর্বোপরি উপজেলায় প্রথম A+ (GPA-5) পেয়ে SSC পরীক্ষায় উত্তির্ণ হলাম তখন চারিদিকে আমার রমরমা প্রশংসা ছড়িয়ে গেছে অমুকের ছেলে কি মেধাবী? স্কুল থেকে ছোট ভাই বোনেরা আমার সাথে দেখা করতে আসতে থাকে, অভিভাবকদের ও আগ্রহ কম ছিলো না আমাকে ঘিরে। কিন্তু হায় তখনো আমি জানতাম না যে আমার জীবনে কি ঘটে গেছে? আমার আপন খালাতো ভাই ২৪ তম বিসিএস ক্যাডার তখন সরকারি আযিযুল হক কলেজের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন সেই সুবাদে আমার উত্তর বঙ্গের শ্রেষ্ট বিদ্যাপিঠ সরকারি আযিযুল হক কলেজে পড়ার সুযোগ হয়। ভাই আমার অত্যন্ত মেধাবী ও চৌকস ব্যক্তিত্ব। প্রথম ভাইয়ের সাথে আমার যেদিন দেখা হয় তিনি আমার সার্টিফিকেট দেখে চোখ কপালে তুলে বললেন একি অবস্থা তোর? ১৮ বছর ৭ মাসে তুই SSC পাশ করেছিস? হায়রে কি করেছিস এটা? তোর তো মাস্টার্স শেষ করে সরকারি চাকুরি নেবার সময়েই থাকবেনা!!!! আমি তখন বয়সের ব্যাপারে প্রথম জানতে পারলাম যে ৩০ বছর পার হলে আর সরকারি চাকুরিতে আবেদন করা যায় না।

আমার বাবা একজন সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তাকে বিষয়টা অবহিত করলে তিনি বুঝতে পারলেন যে তিনি কি বড় ভুল করেছেন। রেজিষ্ট্রেশনের সময় তার সন্তানের খবর না নিয়ে মনের অজান্তে নিজ পুত্রকে ভবিষ্যৎ এ কি ড্রামার মধ্যে ফেলেছেন তা হয়ত আজ তিনি অনুধাবন করতে পারছেন। উল্লেখ্য যে আমার মা ও একজন স্কুল শিক্ষিকা। আমার বাবা মা দুজনই এত উচ্চ শিক্ষিত হবার পর ও আমার বয়সের ব্যাপারে এত উদাসীন ছিলেন তা সত্যি কষ্টদায়ক। যাই হোক হয়ত আমার বাবা মা ভুল করেছে তাই বলে আমার শিক্ষকেরা কি ভাবে পারলো একজন মেধাবী ছাত্রকে ১৮ বছর ৭ মাস বয়সে SSC পাশ করানোর বয়স দিতে? উল্লেখ্য যে আমি ক্লাসের ফাস্ট বয় ছিলাম। আমার শারীরিক গঠন ও উচ্চতা দেখে মনে হত যে আমার বয়স ১২/১৩ হবে হয়তো। আর তখন আমার সত্যিকারের বয়স ছিল মাত্র ১৫ বছর যেখানে সার্টিফিকেটে ১৮ বছর ৭ মাস।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণিবিদ্যা ডিপার্টমেন্টে পড়ার সুযোগ হলো। বিএস সি (অনার্স)সাফল্যের সহিত শেষ করলাম ২০১৫ সালে। ২০১৬ আমি Special Branch Genetics and Molecular Biology থেকে মাস্টার্স অত্যন্ত সাফল্যের সহিত শেষ করলাম। 3.97 (Out of 4) পেয়ে ডিপার্টমেন্ট তথা পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৯-২০১০ সেশনে ২য় স্হান অর্জন করলাম কিন্তু হায় তখন আমার বয়স এসে দাড়ালো ২৮ বছর ১ মাস।

বয়স শেষ চিন্তা আমাকে গ্রাস করতে শুরু করলো। প্রতিনিয়ত মনের সাথে যুদ্ধ করতে থাকলাম। দিন রাত প্রায় ১৬ ঘন্টা পড়াশুনা করতাম কিন্তু এই অল্প সময় দেখতে দেখতে চোখের পলকে ফুরিয়ে গেলো। আমার যখন মোটামুটি সব বই কাভার চাকুরি পরীক্ষার যুদ্ধে আমি প্রস্তুত যখন আমি পরীক্ষায় টিকতে শুরু করলাম ঠিক সেই সময় আমার বয়স ৩০ পেড়িয়ে গেলো। এই সময়ের মধ্যে আমি বেশ কয়েকটা সরকারি চাকুরিতে ভাইভা দিয়েছিলাম কিন্তু চুড়ান্তভাবে মনোনীত হইনি।আমার সার্টিফিকেট বয়স ৩০ পার হওয়ায় আমি সরকারি চাকুরি লাভের অযোগ্য হলাম। উল্লেখ্য যে সরকারি চাকুরি পেতে গেলে অন্ততঃ ২ বছরের একটা প্রস্তুতি লাগে কারো কারো ক্ষেত্রে সেটা আরো বেশি হতে পারে।

আমি এখন সরকারের কাছে মূল্যহীন। সরকারের কাছে আমি বুড়ো হয়ে গেছি। সরকার মনে করছে যে সরকারি উচ্চ বড় কোনো জায়গায় কাজ করতে আমি কোন সামর্থ্য রাখি না।

যারা আমার এই পোস্ট টি পড়ছেন তাদের কাছে আমার একটি প্রশ্ন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা যদি ৭৩ বছর বয়সে দেশ চালাতে পারে তাহলে আমি আমরা কেন ৩০ বছরের পর সরকারি চাকুরিতে প্রবেশ করতে পারবো না?

জো বাইডেন যদি ৭৮ বছর বয়সে পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হতে পারে তাহলে কেন মাত্র ৩০ বছর বয়সে আমরা সামান্য দেশের সরকারের কাজ করার যোগ্যতা হারাবো?

যেখানে দেশের ৭০% মন্ত্রী, এমপিদের বয়স ৫০+ সেখানে কেন মাত্র ৩০ বছর বয়স সরকারি বেসরকারি চাকুরির প্রবেশের বয়সসীমা হবে?

এই সরকারের আমলে বহু বার বহু ভাবে চাকুরির প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধির প্রস্তাব উঠেছিল জাতীয় সংসদে কিন্তু বারবার নিরাশ হতে হয়েছে আর এর প্রধান কারণ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। তিনি স্বয়ং চান না যে বয়স বৃদ্ধি হোক। তিনি বক্তব্যে বলেছেন ৩০ পেরিয়ে গেলে নাকি আমরা বুড়ো হয়ে যাই। হাস্যকর হাস্যকর সত্যি হাস্যকর, আমি আমরা ৩০ পেরোলে যদি বুড়ো হই তাহলে আপনি কি? আপনার মন্ত্রী পরিষদ কি? অতচ আপনি নির্বাচনি ইসতিহারে বয়স বৃদ্ধির বিষয়টি অন্যতম পয়েন্ট হিসেবে রেখেছিলেন।

আমাদের দেশে মেধার কোন মূল্যায়ন নেই। আমাদের সমাজের মানুষ মেধার মূল্য দিতে জানে না। জীবনে কে কি করলো, কে কি করলো না সেটা কি আমাদের দেখার সময় আছে। সামাজের মানুষের কাছে ঔ ব্যক্তি সম্মানিত যে একটা সরকারি চাকুরি করে। আমাদের সমাজের মানুষের কাছে সাত খুন মাফ যদি কোন ব্যক্তি সরকারি চাকুরি পেয়ে যায়। আরে ভাই সরকারি চাকুরি কি মেধার, চরিত্রের মাপকাঠি হতে পারে? উত্তরে যদি বলতে হয় হ্যা পারে সেটা একমাত্র বাংলাদেশে।

বাবা সমতুল্য গুরুজনদের কাছ থেকে, অনেক বড় বড় সরকারি চাকুরি করে এমন বড়ভাইদের কাছে প্রায়ই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়, তাদের কথায় কি করলে জীবনে? অমুক এটা করেছে তমুক ওটা করেছে, তুমি কিছুই করতে পারলে না????
ভাবটা এমন যেন আমরা খুব বড় অপরাধ করেছি, খুব বড় পাপ করেছি আমরা।

সর্বশেষে বলতে চাই এখন সময় এসেছে দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর, বদলাতে হবে চিন্তা চেতনা, জাগ্রত করতে হবে মূল্যবোধ।
***আমরা চাকরি চাই না, কষ্টকরে অর্জিত সার্টিফিকেটের মর্যাদাটা যেন সর্বোচ্ছ ৩৫ বছর পর্যন্ত দেওয়া হয়।

*** আমরা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের বোঝা হয়ে থাকতে চাই না। নিজ যোগ্যতা ও মেধা প্রমাণের সুযোগটুকু সরকারের কাছে ভিক্ষে চাই।

*** আমাদেরকে হতাশাগ্রস্ত করে হাতে মাদক তুলে দিবেন না। দয়া করে কলমটা ধরে রাখার সুযোগ দেন।

*** আমাদেরকে বয়সের ফ্রেমে বন্ধি করে শুধু আমাদের জীবনটাই ধ্বংস করেন নি…
ধ্বংস করেছেন একটি পরিবার এবং অসহায় মা, বাবার স্বপ্ন….

*** দয়া করে আমাদেরকে পড়ার টেবিলে বসার সুযোগ দিন, হতাশাগ্রস্ত ভবঘুরে জীবনের দিকে ঠেলে দিবেন না।

*** করুনার কারনে পশ্চিমবঙ্গ যদি কোন দাবি ছাড়াই চাকরীতে প্রবেশের বয়স বাড়িয়ে ৩৮ থেকে ৪০ করতে পারে, তাহলে হাজারো মানুষের দাবিতে চাকরীর প্রবেশের বয়স মাত্র ৩৫ করে আপনি সত্যিকার Mother of Humanity প্রমাণ করুন।

*** আমদের শিক্ষা অর্জনের মর্যাদাটুকো দেন, আমরা
চাকরি চাই না….

লেখা,
৩৫ আন্দোলনের একজন কর্মী