ঢাকা, বুধবার, ২০ জানুয়ারী ২০২১

ক্যারিয়ার ও বাস্তবতা

:: মো: উজ্জল তালুকদার || প্রকাশ: ২০২০-১০-১৫ ১১:২০:০৯

১. উপকথা ও বাস্তবতা

গ্রীক একটি উপকথা দিয়ে লেখাটি শুরু করব। সিসিফাস ছিলেন করিন্থের রাজা। সুন্দরী নারীদের প্রতি জিউসের লালসা ছিল। একদিন সুন্দরী এজিনাকে জিউস অপহরণ করে। ঘটনাটি সিসিফাস দেখে ফেলে এবং এজিনার বাবা অ্যাসেপাসকে বলে দেয়। ফলে জিউস সিসিফাসের প্রতি রেগে যান ও তাকে শাস্তি দেওয়া অনুমতি দেয়। হেডিস সিসিফাসকে একটি অভিনব শাস্তি দেয়। বিশাল একটি খাড়া পাহাড়ের পাদদেশ থেকে বিরাট একটি গোলাকার পাথরখন্ড সিসিফাসকে পাহাড়ের চূড়ায় তুলতে হবে। যদি সে গোলাকার পাথরটি চূড়ায় তুলতে পারে তবেই মিলবে মুক্তি। আশ্চর্যের বিষয় সিসিফাস যখন পাহাড়ের তলা থেকে চূড়ার কাছাকাছি পৌঁছায় তারপর সিসিফাসের সমস্ত শক্তি লোপ পেয়ে পাথরটি তলায় পড়ে যায়। আবার সে তলা থেকে চূড়ার উদ্দেশ্যে পাথর তোলার কাজে লেগে পড়ে। এভাবে অনন্তকাল ধরে সিসিফাস পাহাড়ের তলা থেকে পাথর তোলার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছিল কিন্তু কখনও সে চূড়ায় পৌঁছাতে পারেনি আর মুক্তিও পায়নি। প্রত্যেকটি মানুষ সিসিফাসের মত। মানুষও চিরস্থায়ী মুক্তির জন্য চেষ্টা করে। তাইতো সে ভাবে স্কুল থেকে কলেজে উঠলেই তো মুক্তি, বা কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলেই মুক্তি। কিন্তু না, মানুষের কষ্ট সংগ্রামের দিন কখনওই শেষ হয় না। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষে চাকুরি আবার চাকুরিতে গেলে পদোন্নতির জন্য চেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়। মানুষের এই চেষ্টার ধারা জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত অব্যাহত রাখতে হয়। এ থেকে মানুষের মুক্তি নাই।

২. সফলতা ও পরিবার

এই পৃথিবী খুবই কঠিন একটি জায়গা। পৃথিবীর মানুষগুলো সফল ব্যক্তিদের ভালবাসে ও মনে রাখে। সফল ব্যক্তিদের নিয়েই সব মাতামাতি। সমাজ তাদের গুরুত্ব দেয়। তাই পৃথিবীতে সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকতে হলে সফলতার কোন বিকল্প নেই। প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার নিজ নিজ জায়গাতে সফল হতে হয়। সফলতার জন্য মানুষের অনুপ্রেরনা লাগে। সেই অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে পরিবার। স্বাভাবিকভাবেই আমরা পরিবারের মধ্যে বড় হই। জন্মের পর থেকে আমাদের মা-বাবা,ভাই-বোন কিংবা অন্যান্য আত্নীয়দের ত্যাগের মাধ্যমে বেঁচে থাকি। আমরা যখন ছোট ও দুর্বল ছিলাম, পরিবার আমাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করেছে। আমাদের জন্য ত্যাগ ও কষ্ট স্বীকার করছে। আমাদের ছোট্ট ছোট্ট আবদারগুলো পূরণ করেছে। মা-বাবার ঋণ কোন দিন শোধ করার মত নয়। আমরা ছোট থেকে বড় হয়েছি। সাথে সাথে আমাদের সেই সব আপন মানুষগুলো বড় থেকে বুড়ো হয়েছে। তাদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব রয়েছে। নিজের প্রতি আমার দায়িত্ব রয়েছে। আমাদের পড়াশুনার স্বপ্নের মধ্যে আমাদের পরিবারেরও স্বপ্ন নিহিত থাকে। সেই স্বপ্নগুলো পরিবারের ত্যাগ, ভালবাসা ও ঋণের সাথে জড়িত থাকে। আপনার দিকে আপনার পরিবার তাকিয়ে আছে। কবে তাদের সন্তান খুশির ও স্বস্তির একটি সংবাদ দিবে। সেই সংবাদটি হল একটি সফলতার সংবাদ। পরিবারের সেই ত্যাগ, ঋণ ও ভালবাসা পরিশোধের অনুভূতি ও উপলদ্ধি থাকতে হবে। আর এটাই আপনার অনুপ্রেরণা হতে পারে।

৩. জীবন ও জীবিকা

পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে হলে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা আবশ্যক বিষয়। এসব মৌলিক চাহিদাগুলো ছাড়া মানুষ বেঁচে থাকতে পারে না। জন্মের পর থেকেই আমাদের এসব চাহিদা পরিবার মেটানো চেষ্টা করে। এখন আমাদের পরিবারের দায়িত্ব কমেছে আর আমাদের দায়িত্ব বেড়েছে। ভালবাসা, ত্যাগ বা ঋণ পরিশোধের দায়িত্বের সাথে সাথে পরিবারের মৌলিক চাহিদাগুলো মেটানো দায়িত্বও আমাদের। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই দায়িত্ব এড়ানো সুযোগ নেই। কারণ এটিই বাংলাদেশের সংস্কৃতি। আমাদের সেই সব মৌলিক চাহিদা পূরণ করার জন্য কিছু না কিছু করতেই হয়। স্বাভাবিকভাবে কেউ আমাদের বিনামূল্যে কিছু দিবে না। এখন আমরা কোন ধরণের কাজ করবেন, এই পছন্দটা শুধুই আমাদের। আমাকে দিয়ে কি সম্ভব, কোন কাজে আমার আগ্রহ ও দক্ষতা আছে; আমাকেই ঠিক করতে হবে। আমরা ব্যবসা করতে পারি কিংবা চাকুরি করতে পারি। আমাদের কাজ ছোট, মাঝারি বা বড় হতে পারে। তবে আজ অথবা কাল যে কোন কাজ আমাদেরকে করতেই হবে।

৪. একটি চাকুরির গল্প

বাংলাদেশে হাজার হাজার চাকুরি প্রার্থী রয়েছে। প্রতি বছর কয়েক হাজার গ্রাজুয়েট বের হচ্ছে। তাদের বেশির ভাগেই স্বপ্ন একটি ভাল চাকুরি। প্রতি বছরই ব্যাংক,বিসিএস ও বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি হচ্ছে। কিন্তু ফাঁকা পদের সংখ্যার চেয়ে চাকুরি প্রার্থীদের সংখ্যা অনেক বেশি। এই বাস্তবতায় একটি গল্প বলি।

একদিন একজন চাকুরি প্রার্থীর সাথে একটি চাকরি দেখা হয়ে গেল। প্রার্থী চাকুরিটিকে দেখে বলল, হে চাকুরি এতদিন তুমি কোথায় ছিলে? তোমাকে যে আমার ভীষণ দরকার। আমি তোমাকেই খুঁজছি। আমার মা বাবা অসুস্থ কিন্তু তাদের চিকিৎসা করাতে পারছি না। ছোট ভাই বোনের পড়াশুনার খরচ দিতে পারছি না। এমন অনেক সমস্যার মধ্যে আমি আছি। চাকুরি বলল, আমি তো রোজ এই পথ দিয়ে হেঁটে যাই। তোমাকে তো আগে দেখি নাই। আর এমন কথা আমি রোজ শুনি। এই যে কিছুক্ষন আগে, আরও অনেক প্রার্থী একই কথা বলল। আমি প্রতি বছর এমন আর্তনাদ শুনে অভ্যস্ত। প্রার্থী বলল, হে চাকুরির তোমাকে যে আমার চাই। কি করে পেতে পারি তোমাকে? চাকুরি বলল, আমি আবেগ দিয়ে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি না, কারও সাথে বৈষম্যও করি না। আর আমি এখানে থাকি না। থাকি আট সাগরের ঐপাড়ে। যদি তুমি সবার আগে ঐ আটটি সাগর পাড়ি দিতে পারো। তবেই আমি তোমার। আমি দিনশেষে তোমাদের মত কোন প্রার্থীর ঘরেই যাই। সেই সাগরগুলো হল: ১.বাংলা সাগর, ২.ইংরেজি সাগর, ৩.গনিত সাগর, ৪.বিজ্ঞান সাগর, ৫.প্রযুক্তি সাগর, ৬.বাংলাদেশ সাগর, ৭.আন্তর্জাতিক সাগর ও ৮. মানসিক দক্ষতার সাগর। এই আটটি সাগর যে পাড়ি দিতে পারবে চাকুরি নামক সেই ব্যক্তি তার ঘরে যাবেই।

৫. চাকুরির পরীক্ষার পদ্ধতি ও ধাপ

আমাদের চাকুরির প্রস্তুতি নেওয়ার আগে পরীক্ষা পদ্ধতি সম্পর্কে পূর্নাঙ্গ ধারণা থাকতে হবে। কোন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির পর চাকুরির প্রার্থীকে কয়েকটি ধাপের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। আর প্রতিটি ধাপে কোন না কোন প্রার্থীকে বাদ দেওয়া হয়। সাধারণত এমসিকিউ পরীক্ষা, লিখিত পরীক্ষা এবং ভাইভা এই তিনটি ধাপ হয়ে থাকে। তবে বর্তমানে চাকুরির ক্ষেত্রে আরও কিছু ধাপ ও পদ্ধতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সেগুলো সম্পর্কেও ধারণা থাকা দরকার। অনেক চাকুরিতে আবেদনের পর: ১. প্রাথমিকভাবে প্রার্থী বাছাই করে ২. বাছাইকৃত প্রার্থীদের ভাইভা নেয় ৩. প্রার্থীদের এমসিকিউ পরীক্ষা নেয় ৪. লিখিত পরীক্ষা নেয় ৫. এ্যাসেসমেন্ট টেস্ট নেয় ৬. ফাইনাল ভাইভা নেয় ৭. ভেরিফিকেশন করে ৮. স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে। এই ৮টি ধাপে উত্তীর্ণ হলেই সেই প্রার্থী চাকুরি পান। তাই চাকুরি পেতে হলে সব ধাপে উর্ত্তীন হবার প্রস্তুতি ও যোগ্য লাগবে।

৬. চাকুরির প্রস্তুতি ও যোগ্যতা

বাংলাদেশে অনেক ধরণের চাকুরি আছে। কোন ধরণের চাকুরি আপনার টার্গেট তার উপর ভিত্তি করে আপনার প্রস্তুতি পরিকল্পনা সাজাতে হবে। ।যেমন: বিসিএসের প্রস্তুতি আর ব্যাংকের প্রস্তুতি এক রকম হবে না। কারণ দুটি পরীক্ষার প্রশ্নের ধরণ আলাদা। প্রতি বছর বিসিএসের প্রশ্ন পিএসসি করে থাকে এবং প্রশ্নের ধরণ ও মার্কস বন্টন একই রকম থাকে। কিন্তু ব্যাংকের বা সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্ন করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। যেমন. ঢাবির আইবিএ, আর্টস অনুষদ, ব্যবসা অনুষদ, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, বুয়েট, বিইউপি কিংবা আহসানউল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। একেক প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার প্রশ্নের ধরণ ও মান বন্টন আলাদা হয়ে থাকে। কোন প্রতিষ্ঠান ইংরেজির উপর আবার কোন প্রতিষ্ঠান গনিতের উপর জোর দিয়ে প্রশ্ন ও মান বন্টন করে। তাই আপনাকে ইংরেজি ও গনিতের উপর জোর দিয়ে প্রস্তুতি নিতে হবে। কেউ গনিতে দুর্বল হলে গনিতে ভাল প্রস্তুতি নিতে হবে আর কেউ ইংরেজিতে দুর্বল হলে সেটাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রস্তুতি নিতে হবে। আপনি কোন ইয়ারে চাকুরির প্রস্তুতি নিবেন? এই প্রশ্নের উত্তর হল আপনি চাকুরি পাওয়ার জন্য কতটা যোগ্য। আর যোগ্য না হলে সেই যোগ্যতা অর্জন করতে কত সময় লাগবে। সেই জন্য আপনি বিগত সালে বিভিন্ন চাকুরির পরীক্ষার প্রশ্ন দেখতে পারেন। সেখানে ৬০-৭০% মার্কস যদি আপনি পান। তবে নিজেকে যোগ্য ভাবতে পারে। আর সেই ৬০-৭০% মার্কস পেতে যতদিন লাগবে যতদিন প্রস্তুতিকাল।

৭. সফলতা ও জীবন

সফলতাই জীবনের সব কিছু নয়। সফলতার মধ্যেই জীবনের সার্থকতা বা সুখ নিহিত থাকে এমনও নয়। তবে সফলতা আমাদের জীবনকে সহজ করে দেয় ও সমাজের জন্য অনেক কিছু করার সুযোগ তৈরি করে দেয়। জীবনে সফলতা পেলে হলে অনুপ্রেরণা, পরিশ্রম ও পরিকল্পনার সাথে আরও কিছু গুন থাকতে হয়। যারা সৎ, নিষ্ঠাবান, বিনয়ী, নিরহংকারী তাদের মধ্যেই সফলতার হার বেশি। সমাজের নারীদের সম্মান করতে হবে। আমাদের আশেপাশে থাকা বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষদের সম্মান করতে হবে। আমরা সবাই একদিন মারা যাব। আমরা অল্প কিছুদিনের জন্য এই পৃথিবীতে এসেছি। কিন্তু মানুষ হিসেবে আমাদের যে দায়িত্ব ও কর্তব্য তা পালন করতে হবে। আলোর পথে, ন্যায়ের পথে, সত্যের পথে থাকতে হবে। খারাপ সংস্কৃতি, অভ্যাগ পরিত্যাগ করতে হবে। অশ্লীলতা, অপবিনোদন এসব থেকে দূরে থাকতে হবে। জীবনের জন্য বিনোদন। বিনোদনের জন্য জীবন নয়।

মানসিক অশান্তি ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক বর্তমান সময়ে বড় একটি চ্যালেঞ্জ। চাকুরি প্রস্তুতিসহ জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও এই বিষয় দুটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই বন্ধু বা জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে সর্তক থাকতে হবে। সামাজিক মিডিয়া কিংবা বন্ধুদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কোন ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। সর্বোপরি, আপনার জীবন আপনাকেই সাজাতে হবে। আপনি ভাল হবেন নাকি খারাপ হবেন;সেটা আপনার সিদ্ধান্ত। যেমন. ইন্টারনেটে আপনি ভাল ও খারাপ উভয় কাজ করতে পারেন। আমাদের আশেপাশে পেশার দিক অনেক সফল মানুষ আছে কিন্তু আমাদের জীবন ও পেশা উভয় দিক থেকে সফল মানুষ দরকার। সফলতার পিছে ছুটতে গিয়ে জীবনটা হারানো যাবে না। কারণ জীবন একটাই, এই জীবন হারিয়ে গেলে আর পাওয়া যাবে না। তাই জীবনের প্রতিটি মুর্হূত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি মুর্হূতকে সৎভাবে কাজে লাগাতে হবে। আমাদের বর্তমানের কর্ম ও পরিশ্রমই আমাদের ভবিষৎ কর্মফল ও ভবিষৎ জীবন।

লেখক,
প্রভাষক
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা ডিসিপ্লিন
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইল: ahmedtayabreuzzal@gmail.com